Breaking News

বাপ বলেছিলেন ‘কামার হবি’—সেই ছেলেই আজ আলমডাঙ্গার স্বর্ণ জগতের উজ্জ্বল নামঃজলিল

বশিরুল আলম,আলমডাঙ্গা, (চুয়াডাঙ্গা) প্রতিনিধি
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

বশিরুল আলম, আলমডাঙ্গা (চুয়াডাঙ্গা) থেকেঃ চারতলা মোড়, আলমডাঙ্গা। প্রতিদিনের চেনা ভিড়, মানুষের আনাগোনা, সোনার দোকানের ঝলমলে আলো। এই আলো-ঝলকানির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক মানুষের দীর্ঘ সংগ্রাম, অপমান পেরিয়ে উঠে আসার গল্প, আর কৃতজ্ঞতায় ভেজা এক নাম—ফাতেমা জুয়েলার্স।
এক বিকেলে ‘ফাতেমা জুয়েলার্স’-এ জলিল ভাইয়ের সঙ্গে গল্প করতে গিয়েছিলাম। দোকানের ভিড় সামলাতে সামলাতে কথা বলার সময় খুব কমই মেলে। তবু দোকানের এক কোণ ঘেঁষে রাখা ছোট্ট টুলে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে শুরু হলো স্মৃতির ঝাঁপি খোলা। বয়স বাড়লে মানুষ যেমন অতীতে ফিরে যেতে ভালোবাসে, জলিল ভাইও তেমনি ফিরে গেলেন প্রায় চার দশক আগের এক অনিশ্চিত সময়ে।

ছাত্রজীবনে জলিল ভাইকে দূর থেকেই অনুসরণ করতাম। তখন ব্যবসায়ী জলিল নয়—আধুনিক পোশাকে, লিনেনের হাফশার্টে, পরিপাটি চলনে তিনি ছিলেন আলমডাঙ্গার তরুণদের কাছে এক আলাদা আকর্ষণ। মনে হতো, জলিল ভাইয়ের মতো একটা হাফশার্ট যদি আমারও থাকতো!
কিন্তু সেই বাহ্যিক স্মার্টনেসের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অদম্য স্বপ্ন—নিজের কিছু করার স্বপ্ন।
আলমডাঙ্গার ছত্রপাড়া গ্রামের শামসুদ্দিন মিয়া ছিলেন অবস্থা সম্পন্ন পরিবারের কর্তা। ছেলে আব্দুল জলিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করে বাড়ি ফিরে যখন স্বর্ণের দোকান দেওয়ার কথা বললেন, তখন বাবার কাছ থেকেই পেলেন সবচেয়ে কঠিন আঘাত।
স্পষ্ট ভাষায় শামসুদ্দিন মিয়া বলে দেন—“স্বর্ণকার আর কামার একই। এ কাজে টাকা দেওয়া যাবে না।”
একটি বাক্য, একটি উপাধি—যা জলিলকে ভেতর থেকে ভেঙে দিয়েছিল। বেকার যুবক জলিলের তখন কোনো পুঁজি নেই, নেই কোনো আশ্রয়। কোথায় যাবেন, কী করবেন—সবকিছুই অন্ধকার।
সেই অন্ধকারে আলো হয়ে পাশে দাঁড়ান বড় বোন। কলেজপাড়ায় যাঁর বাড়িতে থেকে জলিল লেখাপড়া করেছিলেন, সেই বোনই নিঃশব্দে বলেছিলেন—
“আগে কাজটা শেখো, তারপর ব্যবসা শুরু করবে।”
বোনের দেওয়া টাকাকে সম্মান জানাতে জলিল চলে যান কুষ্টিয়ায় এক আত্মীয় স্বর্ণকারের দোকানে। টানা এক বছর—শুধু কাজ শেখা, হিসাব বোঝা, ক্রেতার মন পড়া। সেই এক বছর ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ।
১৯৮৮ সালে আলমডাঙ্গার চারতলা মোড়ে ছোট্ট একটি দোকানে যাত্রা শুরু করে ফাতেমা জুয়েলার্স। তখনকার অনুন্নত শহরে তিনি সাহস করে প্রায় পুরো মূলধন খরচ করেন দোকানের ডেকোরেশনে। তিন দেয়ালজুড়ে আয়না—যেখানে দাঁড়ালে নিজের অসংখ্য প্রতিবিম্ব দেখা যেত।
মানুষ প্রথমে সোনা কিনতে নয়, আয়নায় নিজেকে দেখতে আসতো। তারপর ধীরে ধীরে বিশ্বাস জন্ম নিতো।
ফাতেমা জুয়েলার্সের সুনামের কথা একদিন পৌঁছায় শামসুদ্দিন মিয়ার কানেও। কৌতূহল আর দ্বিধা নিয়ে একদিন তিনি নিজেই ছেলের দোকানে আসেন। যে ছেলেকে একদিন ‘কামার’ বলেছিলেন, তার সাজানো দোকান, মানুষের ভিড়, চোখে-মুখে আত্মবিশ্বাস—সব দেখে তিনি স্তব্ধ হয়ে যান।
সেদিন কিছু না বললেও, সেদিনই বদলে যায় বাবার দৃষ্টি।
অনেকেই জানতে চান, ফাতেমা জুয়েলার্সের ‘ফাতেমা’ কে? তিনি কেউ নন—সেই বড় বোন। যাঁর আশ্রয়ে জলিল মানুষ হয়েছেন, যাঁর দেওয়া টাকায় শুরু হয়েছিল এই পথচলা। মাতৃসম সেই বোনের প্রতি কৃতজ্ঞতা থেকেই দোকানের নাম—ফাতেমা জুয়েলার্স।
সময় বদলেছে। ছোট্ট দোকান আজ বড় হয়েছে, ব্যবসার পরিধি বেড়েছে বহুগুণ। ক্রেতাদের স্বার্থে প্রায় ৭৮ লক্ষ টাকা ব্যয়ে আধুনিক হলমার্ক মেশিন বসানো হয়েছে। যে জলিল একদিন বোনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন, আজ তিনি কোটি কোটি টাকার মালিক।
তবু গল্প করতে বসলে তাঁর কণ্ঠে অহংকার নয়—শোনা যায় কৃতজ্ঞতা। বাবার দেওয়া ‘কামার’ উপাধি আজ আর অপমান নয়, বরং অনুপ্রেরণা।
ফাতেমা জুয়েলার্স আজ শুধু একটি দোকান নয়—এটি প্রমাণ, অবিশ্বাস, অবহেলা আর না-বলা অপমান পেরিয়েও মানুষ নিজের আলো নিজেই জ্বালাতে পারে।

বিষয়:

এলাকার খবর

সম্পর্কিত